Search

Saved articles

You have not yet added any article to your bookmarks!

Browse articles

টানা তিন বছর ধরে বিশ্বব্যাপী ইস্পাতের চাহিদা দুর্বল রয়ে গেছে

কোভিড-১৯, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং উন্নয়ন ব্যয় হ্রাসসহ বিশ্বব্যাপী এবং অভ্যন্তরীণ ব্যাঘাতের কারণে বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্প তিন বছর ধরে তীব্র মন্দার মুখোমুখি হয়েছে। উৎপাদন ক্ষমতা চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি, যার ফলে মিলগুলি সম্ভাবনার অনেক নিচে চলে যাচ্ছে। শিল্প নেতারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে চাহিদা পুনরুদ্ধার ছাড়া অব্যাহত বিনিয়োগ একত্রীকরণ এবং প্রতিযোগিতার ক্ষতির দিকে পরিচালিত করতে পারে। তবে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আসন্ন অবকাঠামো প্রকল্পগুলির দ্বারা পরিচালিত ২০২৭ সালের মধ্যে পুনরুদ্ধারের জন্য আশাবাদ এখনও রয়ে গেছে।

তিন বছর ধরে ধুঁকছে ইস্পাত খাত, পুনরুদ্ধারের আশা ২০২৭ সালে

বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্প টানা তিন বছর ধরে দেশীয় ও বৈশ্বিক নানা সংকটে বিপর্যস্ত। ভারতের বাজার গোয়েন্দা সংস্থা বিগমিন্ট জানিয়েছে, অর্থনৈতিক সক্ষমতার একটি সূচক হিসেবে বিবেচিত ইস্পাতের চাহিদা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও দুই বছর সময় লাগতে পারে।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইস্পাত খাতের এই দুরবস্থা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির প্রতিফলন। প্রথমে এল কোভিড-১৯ মহামারি, তারপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যা বৈশ্বিক স্ক্র্যাপ সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করে। দেশে আবার টাকার মান পতন, সরকারি ব্যয় হ্রাস, এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তন ইস্পাত খাতের অবস্থাকে আরও কঠিন করে তোলে, কারণ উন্নয়ন ব্যয় ব্যাপকভাবে কমে যায়। স্থায়ী উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি, ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা রিয়েল এস্টেট ও বেসরকারি নির্মাণ খাতকে দুর্বল করেছে—যা ইস্পাতের প্রধান ক্রেতা।

বর্তমানে দেশের ইস্পাত কারখানাগুলোর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১.৩৬ কোটি টন, কিন্তু চাহিদা নেমে এসেছে মাত্র ৪৫ লাখ টনে, জানিয়েছে বিগমিন্ট।

তবুও কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ধারণা দিচ্ছে, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৪.৮% থেকে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ৬.৩% পর্যন্ত বাড়তে পারে। বিগমিন্ট বলছে, “সবাই এখন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন এবং স্থগিত থাকা অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের দিকেই তাকিয়ে আছে।”

২০২৭ সালের মধ্যে আরও ৩০ লাখ টন নতুন উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার কথা। তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে এই সম্প্রসারণ বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়াতে পারে। ২০২৫ সালে কাঁচা ইস্পাত উৎপাদন ১১% কমবে, যা এর আগের বছরের ১০% পতনের ধারাবাহিকতা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি মন্দা অব্যাহত থাকে, তাহলে খাতটি কয়েকটি বড় কোম্পানির দখলে চলে যেতে পারে, ফলে ছোট মিলগুলো টিকে থাকা কঠিন হবে।

দেশের অন্যতম শীর্ষ উৎপাদক আবুল খায়ের স্টিল (AKS) সম্প্রতি নতুন একটি কারখানা চালু করেছে, যা বছরে ১৬ লাখ টন ডিফর্মড বার উৎপাদনে সক্ষম। এর ফলে কোম্পানিটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ লাখ টনে, যা বিএসআরএমের (BSRM) ২৪ লাখ টন সক্ষমতার চেয়ে বেশি।

“শিল্প এখন খুঁড়িয়ে চলছে,” বলেন বিএসআরএমের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত। “সরকারি উন্নয়ন ব্যয় না বাড়লে খাতটির পুনরুজ্জীবন কঠিন হবে।”

আরআরএম স্টিলের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (BSMA) সাধারণ সম্পাদক সুমন চৌধুরী বলেন, নির্মাণ খাতের ধীরগতি ও তারল্য সংকটের কারণে মিলগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। “এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়, অনেক উন্নয়নশীল দেশই একই অবস্থায় রয়েছে,” তিনি বলেন।

তিনি সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতাই এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। ১.৩৬ কোটি টন সক্ষমতা থাকলেও বাস্তব চাহিদা মাত্র ৪৫ লাখ টন, যেখানে মেগা প্রকল্পগুলোর সময় সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ৭৫ লাখ টন। নতুন বিনিয়োগ অব্যাহত থাকলে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে সক্ষমতা বেড়ে ১.৫ কোটি টনে পৌঁছাতে পারে—যা বাস্তব চাহিদার অনেক বেশি।

চৌধুরী জানান, অ্যাসোসিয়েশনটি সরকার ও ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কাজ করছে কাঁচামালের সরবরাহ স্থিতিশীল করা, আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা, এবং একটি স্থিতিশীল নীতিগত পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে।

আনোয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বিএসএমএর সাবেক সভাপতি মনোয়ার হোসেন মনে করেন, সংকটের শুরু মহামারির সময় থেকেই। “তখন বৈশ্বিক স্ক্র্যাপের দাম প্রতি টন ৪০০ ডলার থেকে ৭০০ ডলার-এ পৌঁছায়, কিন্তু স্থানীয় উৎপাদকরা সেই খরচ বাজারে পাস করতে পারেনি,” তিনি বলেন। “এরপর যুদ্ধ, শিপিং জট, আর টাকার অবমূল্যায়ন—সব মিলিয়ে চাপ আরও বেড়েছে।”

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন চাহিদাকে আরও দুর্বল করেছে। “সরকারি প্রকল্প, যা একসময় আমাদের প্রধান বাজার ছিল, এখন প্রায় থমকে গেছে। আমরা প্রায় ৪৫% ব্যবসা হারিয়েছি।”

ছোট ও মাঝারি মিলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মনোয়ার হোসেন আশঙ্কা করছেন, খাতটি শিগগিরই কয়েকটি বড় কোম্পানির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। “যদি চার-পাঁচটি কোম্পানি বাজার দখল করে নেয়, তাহলে প্রতিযোগিতা হারিয়ে যাবে—যা এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর,” তিনি বলেন।