Search

Saved articles

You have not yet added any article to your bookmarks!

Browse articles

বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আমদানি বাড়াতে বাংলাদেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আহ্বান

ইউরোপীয় কূটনীতিক এবং ব্যবসায়ী নেতারা বাংলাদেশকে ইইউ থেকে আমদানি বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ব্লকের বৃহৎ বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সাহায্য করা যায়, বিশেষ করে ঢাকা একটি পারস্পরিক শুল্ক চুক্তির আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সম্মত হওয়ার পর। ঢাকায় বিডা সংলাপে ইইউ প্রতিনিধিরা আরও ইউরোপীয় বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য শুল্ক, সরবরাহ, মান এবং নিয়ন্ত্রক প্রয়োগে আরও গভীর সংস্কারের উপর জোর দেন। একাধিক ইইউ দেশের রাষ্ট্রদূতরা স্বচ্ছতা, পূর্বাভাসযোগ্য নিয়ন্ত্রণ, উন্নত শাসনব্যবস্থা এবং দ্রুত অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েশনের কাছাকাছি আসার সাথে সাথে, ইইউ জিএসপি+-এর সাথে সংযুক্ত সংস্কারের জন্য চাপ দিচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলি বন্দর বিলম্ব এবং নিয়ন্ত্রক অসঙ্গতির মধ্যে মসৃণ কার্যক্রম চায়। কর্মকর্তারা বলছেন যে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে দ্বিমুখী বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং খাতভিত্তিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ইউরোপীয় কূটনীতিক ও ব্যবসায়িক নেতারা বাংলাদেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে আমদানি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ব্লকের সঙ্গে ঢাকার বৃহৎ বাণিজ্য ঘাটতি কমানো যায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক শুল্ক চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর বিষয়টি নতুনভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

সোমবার ঢাকায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) কার্যালয়ে ব্যবসা পরিবেশ বিষয়ক যৌথ সংলাপে ইইউ প্রতিনিধিরা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে গুরুত্বপূর্ণ খাতে গভীর সংস্কারের জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানান।

সংলাপের উদ্বোধনী বক্তব্যে বাংলাদেশে ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, উভয় পক্ষই পারস্পরিকভাবে লাভজনক একটি বিনিয়োগ অংশীদারত্বের দিকে এগোচ্ছে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে সহযোগিতা, ন্যায্য প্রতিযোগিতা ও নিরপেক্ষ নিয়ম বাস্তবায়নের ওপর।

সরকার ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণকারীরা জানান, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো একটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য কাঠামো চায়, বিশেষত যেহেতু বাংলাদেশ ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করেছে যে তারা সয়াবিন, গম, বিমান, এলএনজি ও যন্ত্রপাতিসহ আরও বেশি আমেরিকান পণ্য কিনবে, যার বিনিময়ে ২০ শতাংশ তুলনামূলক কম পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা পাওয়া যাবে।

এই প্রেক্ষাপটে, ইইউ মিশন ও ব্যবসায়ীরা একই ধরনের প্রতিশ্রুতি আশা করছে এবং বলছে যে বিদ্যমান ভারসাম্যহীনতা দূর করতে ইউরোপীয় যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ও অন্যান্য পণ্যের আমদানি বাড়াতে হবে।

ব্লক হিসেবে ইইউ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। ২০২৪ সালে দুই পক্ষের পণ্যবাণিজ্য দাঁড়ায় ২২.২ বিলিয়ন ইউরো, যেখানে ইইউ-এর ঘাটতি ছিল ১৭.৫ বিলিয়ন ইউরো—ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী।

একই বছরে ইইউ বাংলাদেশের কাছ থেকে মোট আমদানির প্রায় ৯৪ শতাংশই ছিল তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল। অন্যদিকে, বাংলাদেশে ইইউ-এর রপ্তানির মধ্যে ৩৫ শতাংশ ছিল যন্ত্রপাতি ও যান্ত্রিক সামগ্রী এবং ২৩ শতাংশ ছিল রাসায়নিক পণ্য।

সেবা খাতে ২০২৩ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দাঁড়ায় ২ বিলিয়ন ইউরো, যেখানে ইইউ-এর উদ্বৃত্ত ছিল ০.৮ বিলিয়ন ইউরো। পণ্য ও সেবা মিলিয়ে মোট বাণিজ্য হয় ২৩.৯ বিলিয়ন ইউরো।

ইউরোচ্যাম বাংলাদেশের চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ বলেন, ইউরোপীয় ব্যবসা ও কূটনৈতিক মিশনগুলো বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণকে সামনে রেখে এফডিআই প্রবাহ বাড়ানো ও বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবিলায় সমন্বিত লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

তিনি কাস্টমস, লজিস্টিকস, মান নিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রক প্রয়োগ ও আমদানি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন এবং সভায় উপস্থাপিত কেস স্টাডির উদাহরণ তুলে ধরেন।

ইইউর বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা বলেন, বাংলাদেশে উচ্চমানের ইউরোপীয় বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে নিয়ন্ত্রক পূর্বানুমানযোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং ডিজিটালাইজেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিভিন্ন ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

ডাচ রাষ্ট্রদূত জোরিস ভ্যান বোমেল স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন এবং পানি, কৃষি ও লজিস্টিক খাতে সম্ভাবনা উন্মোচনে বাংলাদেশের একটি "আধুনিক ভাবমূর্তি" তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।

ডেনিশ রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার জি-টু-জি ও পিপিপি প্রকল্পের অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে বলেন, উন্নত শাসনব্যবস্থা, দ্রুত নিয়ন্ত্রক জটিলতা সমাধান এবং সময়মতো অনুমোদন অত্যন্ত জরুরি।

ইতালীয় রাষ্ট্রদূত অ্যান্তোনিও আলেকসান্দ্রো সিরামিক, চামড়া ও ডিজাইন শিল্পে নতুন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও এসএমই অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর জোর দেন।

স্প্যানিশ রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল সিস্তিয়াগা ওচোয়া দে চিনচেত্রু ইইউকে বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

সুইডিশ রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইক্স সুইডেনের বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক ও টেকসই ফ্যাশনের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে স্পষ্টতর নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর আহ্বান জানান।

ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-চার্লেট দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা নিশ্চিত করতে উন্নত শাসনব্যবস্থা ও লাভ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার উন্নতির ওপর গুরুত্ব দেন।

জার্মান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত আনজা কারস্টেন চলমান সংস্কারকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, উন্নত কারিগরি প্রশিক্ষণ, ডাবল ট্যাক্সেশন চুক্তি হালনাগাদ এবং বাংলাদেশের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি উন্নয়নের উদ্যোগ প্রয়োজন।

সরকারের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মোনিরুজ্জামান ডিজিটালাইজেশন, বে টার্মিনাল ও লালদিয়া প্রকল্পসহ আধুনিকায়ন কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে বলেন, এর ফলে বড় জাহাজ নোঙর করতে পারবে এবং ২৪/৭ কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হবে।

বিডা নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ সমাধান এবং বার্ষিক "রেজাল্ট কার্ড" বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোকে স্থানীয় ও আঞ্চলিক কার্যক্রমে আকৃষ্ট করতে চায় সরকার।

প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুত্ফে সিদ্দিকি সংস্কারের রোডম্যাপ স্পষ্টকরণ এবং এলডিসি উত্তরণের আগেই ইইউ-এর সঙ্গে সক্রিয় সম্পৃক্ততার ওপর জোর দেন।

ইউরোপীয় কূটনীতিকদের এই চাপকে বিশ্লেষকরা দেখছেন বিশ্ব শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে—বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইইউ সবাই দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত-বর্ধনশীল এই অর্থনীতিতে প্রভাব বাড়াতে চাইছে।

এলডিসি উত্তরণের পর ইইউ-এর শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর সম্ভাবনা থাকায় ব্রাসেলস এখন জিএসপি+ মানদণ্ড অনুযায়ী নিয়ন্ত্রক সংস্কারের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ইউরোপীয় ব্যবসাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করার সহজীকরণ দাবি করে আসছে। কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে ধীরগতি, বন্দর জট, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং নীতিনির্ধারণে অসঙ্গতি—সব মিলিয়ে বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি উৎস বহুমুখীকরণ, উৎপাদন খাত আধুনিকীকরণ এবং উন্নত ইউরোপীয় প্রযুক্তি গ্রহণই বেশি মূল্যসংযোজন শিল্প গড়তে সহায়ক হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে ইইউর আহ্বান বাংলাদেশের রপ্তানি কমানো নয়; বরং দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোই মূল লক্ষ্য।