বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায়, বৈশ্বিক বাজারে তীব্র মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব
বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম ইতিহাসে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক বাজারে স্বর্ণের দামের উল্লম্ফনের প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স (২৮.৩৪৯৫ গ্রাম) স্বর্ণের দাম ৪,০০০ ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন গতকালের তুলনায় প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম বাড়িয়ে রেকর্ড Tk ২,০৯,১০০ নির্ধারণ করেছে।
বৈশ্বিক স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি
বিশ্বব্যাপী স্বর্ণের দামের এই উত্থান এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার কমার প্রত্যাশা, বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক স্বর্ণ ক্রয়ের কারণে। রয়টার্সের তথ্যানুসারে, গতকাল স্পট গোল্ডের দাম স্থিতিশীল ছিল ৪,০৩৭.৯৫ ডলার (Tk ৪৯১,০০০), যা বাজারের শক্তিশালী অবস্থানকে নির্দেশ করে।
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধি
অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতির সময়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের আকর্ষণ বেড়েছে। এমন অনিশ্চিত সময়ে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণে ঝুঁকছেন, কারণ এটি সাধারণত তার মূল্য ধরে রাখে বা বাড়ায়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে ইসরায়েল-গাজা সংঘাত পর্যন্ত, বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন।
এই বছর এপ্রিল মাসে স্বর্ণের দামে প্রথম বড় উত্থান ঘটে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন। এরপর আগস্টে, ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে ট্রাম্পের সমালোচনার পর দাম আবারও বেড়ে যায়, আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ মজুদ বৃদ্ধি
২০২২ সাল থেকে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রতি বছর এক হাজার টনেরও বেশি স্বর্ণ কিনছে — যা ২০১০ থেকে ২০২১ সালের গড় বার্ষিক ৪৮১ টনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পোল্যান্ড, তুরস্ক, ভারত, আজারবাইজান ও চীন ছিল গত বছরের প্রধান ক্রেতা।
টাকার অবমূল্যায়নে স্থানীয় বাজারে দাম বৃদ্ধি
বাংলাদেশ সরাসরি বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ আমদানি না করলেও স্থানীয় বাজারের দাম বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। টাকার তীব্র অবমূল্যায়নের ফলে স্থানীয় দামে অতিরিক্ত চাপ পড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে এখন পর্যন্ত টাকার মান মার্কিন ডলারের বিপরীতে ৪৩ শতাংশ কমে গেছে, যার ফলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে।
বাংলাদেশে অধিকাংশ স্বর্ণ আসে বিদেশ ফেরত যাত্রীদের মাধ্যমে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) ব্যাগেজ নীতির আওতায়।
চাহিদা সরবরাহের চেয়ে বেশি
বাংলাদেশে বছরে আনুমানিক ২০ থেকে ৪০ টন স্বর্ণের চাহিদা রয়েছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক পথে আসে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৪৫.৬ টন স্বর্ণ দেশে এসেছে, যা এখনও ভোক্তা চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট নয় — বিশেষ করে বিয়ের মৌসুম ও উৎসবের সময়।
এছাড়া অভিযোগ আছে যে, আমদানি করা স্বর্ণের একটি অংশ পাচার হয়ে ভারতে চলে যায়, যার ফলে দেশের বাজারে সরবরাহ সংকুচিত হয়ে দাম আরও বেড়ে যায়।