মার্কিন চাপ এবং রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আরোপ সত্ত্বেও ভারত রাশিয়ান তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে। ভারত তার জ্বালানি নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চাপের সম্মুখীন হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে রাশিয়ান তেলের আমদানিতে ভারতের দ্বিধা
ভারত বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, দেশের জ্বালানি কৌশলে জাতীয় স্বার্থই সর্বাগ্রে, এমন সময়ে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, নয়াদিল্লি রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদিও ভারত সরাসরি কোনও নীতিগত পরিবর্তন নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি, বাণিজ্য চিত্র ও পদক্ষেপে অর্থনৈতিক চাহিদা ও ভূরাজনৈতিক চাপের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চিত্র ফুটে উঠেছে।
ভারতের তেলের হিসাব: রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা কতটা?
বিশ্বের অন্যতম বড় তেল আমদানিকারক দেশ ভারত তার চাহিদার ৮৫ শতাংশেরও বেশি তেল বিদেশ থেকে আমদানি করে। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার আগে, ভারতের তেলের মূল উৎস ছিল মধ্যপ্রাচ্য। কিন্তু যুদ্ধের ফলে রাশিয়ার ডিসকাউন্টেড (ছাড়যুক্ত) তেল পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
২০২৪ সালে, ভারতের মোট অপরিশোধিত তেলের আমদানির প্রায় ৩৬ শতাংশ এসেছিল রাশিয়া থেকে যেখানে যুদ্ধের আগে তা ছিল মাত্র ২ শতাংশ। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশটি এ বছর প্রতিদিন প্রায় ১৮ লাখ ব্যারেল রাশিয়ান তেল কিনেছে, যা মস্কোর মোট রপ্তানির প্রায় ৩৭ শতাংশ কেবল চীনের পরে দ্বিতীয় স্থানে।
ট্যারিফ কি তেল আমদানিতে প্রভাব ফেলেছে?
ট্রাম্পের দাবি সত্ত্বেও, বাণিজ্যিক পরিসংখ্যান আরও জটিল চিত্র তুলে ধরে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের রাশিয়ান তেল আমদানি দৈনিক ১৬ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা চলতি বছরের গড়ের চেয়ে প্রায় ১.৬ লাখ ব্যারেল কম।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই পতন মূলত দামের ওঠানামার কারণে, কোনও নীতিগত পরিবর্তনের কারণে নয়। কারণ তেল আমদানির চুক্তিগুলো সাধারণত এক মাস আগেই সম্পন্ন হয়। ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্কের প্রকৃত প্রভাব অক্টোবরের শেষ নাগাদ বোঝা যাবে।
তবে ট্যারিফের প্রভাব ইতোমধ্যে অন্য খাতে পড়তে শুরু করেছে। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি — যা তার শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার — সেপ্টেম্বর মাসে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২% কমেছে এবং আগের মাসের তুলনায় ২০% এর বেশি হ্রাস পেয়েছে।
তবুও, সেপ্টেম্বরে ভারতের মোট রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩৬.৩৮ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬.৭% বেশি, মূলত চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে রপ্তানি বৃদ্ধির কারণে।
রাশিয়ার প্রতি ভারতের নির্ভরতা কেন?
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে ইউরোপের দিকে সরবরাহ ঘুরে যাওয়ায় তারা রাশিয়া থেকে আমদানি বাড়াতে বাধ্য হয়। সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রই ভারতকে এমন আমদানিতে উৎসাহিত করেছিল, বৈশ্বিক বাজার স্থিতিশীল রাখতে।
ছাড়যুক্ত রাশিয়ান তেল ভারতীয় রিফাইনারিগুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করেছে, যার ফলে দেশীয় জ্বালানির দাম অনেকটা স্থিতিশীল থেকেছে। যদিও ২০২৩–২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪–২৫ এ ছাড়ের পরিমাণ ১৪% থেকে কমে ৭%-এ নেমেছে, তবুও রাশিয়ার তেল এখনো তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী।
ভারত বলছে, তাদের আমদানিই বৈশ্বিক তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হয়েছে, যদিও পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
রাশিয়ার বিকল্প আছে কি ভারতের?
ভারত এখনো বড় মাত্রায় মধ্যপ্রাচ্য — বিশেষ করে ইরাক ও সৌদি আরব — থেকে তেল আমদানি করে। ২০২৪ সালে এ উৎসগুলো থেকে ভারতের আমদানি ছিল মোট তেলের ৪৫ শতাংশ, যা ২০২২ সালের আগে ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ।
বিশ্লেষক সুমিত রিতোলিয়া বলেন, ভারতীয় রিফাইনারিগুলো বিভিন্ন গ্রেডের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করতে পারে, তাই কারিগরি দিক থেকে কোনও বড় বাধা নেই। তবে রাশিয়ার বিকল্প খুঁজে পাওয়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে।
“প্রযুক্তিগতভাবে বিকল্প সরবরাহ সম্ভব হলেও, সেগুলোর খরচ বেশি হবে,” তিনি বলেন।
রাশিয়ার তেল আয় এখনো টিকে আছে
ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থনৈতিক উৎস বন্ধ করতে পশ্চিমা দেশগুলো বহুবার চেষ্টা করেছে রাশিয়ার তেল রপ্তানি আয় কমাতে। কিন্তু রাশিয়া সফলভাবে তার রপ্তানি চীন ও ভারতের মতো বিকল্প ক্রেতাদের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে, যার ফলে বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব এখনো অব্যাহত রয়েছে — পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও।