কেনিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাইলা ওডিঙ্গা ৮০ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। কেনিয়ার রাষ্ট্রপতি উইলিয়াম রুটো তাকে "গণতন্ত্রের জনক" হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং সাত দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছেন। ভারতের নরেন্দ্র মোদী এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সিরিল রামাফোসা সহ বিশ্ব নেতারা একজন উচ্চপদস্থ রাজনীতিবিদ এবং গণতন্ত্রপন্থী আইকন হিসেবে ওডিঙ্গার উত্তরাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। পাঁচবারের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ওডিঙ্গা কেনিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং দেশের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বন্দী ছিলেন। তার মৃত্যু কেনিয়ার রাজনীতিতে একটি যুগের সমাপ্তি ঘটায়।
কেনিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাইলা ওডিঙ্গা ৮০ বছর বয়সে মারা গেছেন বলে পরিবারিক সূত্র বিবিসিকে নিশ্চিত করেছে।
ওডিঙ্গা বুধবার ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। জানা গেছে, সকালে হাঁটার সময় তিনি অচেতন হয়ে পড়েন এবং তাকে দেবমাথা হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানান, তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। প্রাণরক্ষার চেষ্টা ব্যর্থ হলে স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৫২ মিনিটে (০৪:২২ GMT) তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওডিঙ্গার স্বাস্থ্য নিয়ে নানা জল্পনা চলছিল, যদিও তার পরিবার ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা দাবি করেছিলেন তিনি গুরুতর অসুস্থ নন।
প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো ওডিঙ্গাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাকে “সাহসের আলোকবর্তিকা” এবং “আমাদের গণতন্ত্রের জনক” বলে অভিহিত করেছেন।
জাতির উদ্দেশে ভাষণে রুটো বলেন, “রাইলা আমোলো ওডিঙ্গা সত্যিই এক প্রজন্মে একবার জন্ম নেওয়া নেতা। তার আদর্শ রাজনীতির ঊর্ধ্বে, এবং তার উত্তরাধিকার প্রজন্মের পর প্রজন্ম কেনিয়ার পথ দেখাবে।” তিনি সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন এবং জানান, ওডিঙ্গাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে।
বিশ্বনেতারাও শোক প্রকাশ করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ওডিঙ্গাকে “একজন মহৎ রাষ্ট্রনায়ক এবং ভারতের প্রিয় বন্ধু” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা তাকে বলেছেন “একজন নেতা যিনি তার দেশ ও মহাদেশের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রেখেছিলেন,” আর জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হাকাইনদে হিচিলেমা ওডিঙ্গাকে বলেছেন “গণতন্ত্রের এক অক্লান্ত যোদ্ধা, যার উত্তরাধিকার চিরকাল টিকে থাকবে।”
এর আগে প্রেসিডেন্ট রুটো নাইরোবিতে ওডিঙ্গার বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রী আইডা ওডিঙ্গা ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুসালিয়া মুদাভাদি ও আইডা ওডিঙ্গার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ভারতে যাবে, যাতে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা তদারকি করা যায়।
ওডিঙ্গার সমর্থকেরা ইতোমধ্যে পশ্চিম কেনিয়া ও নাইরোবির বিভিন্ন অঞ্চলে রাস্তায় নেমে শোক প্রকাশ করছেন।
কেনিয়ার রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে ওডিঙ্গা তার অনন্য রাজনৈতিক প্রভাব ও গণসমর্থনের জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি পাঁচবার রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তবে প্রতিবারই পরাজিত হন এবং ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন, প্রায়ই অভিযোগ করেন যে তার বিজয় “ছিনতাই” করা হয়েছে।
২০১৭ সালে কেনিয়ার সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াত্তার বিজয় বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দিলে ওডিঙ্গা আংশিকভাবে তার অবস্থানের ন্যায্যতা পান। তবে তিনি পরবর্তী পুনর্নির্বাচন বর্জন করেন এবং নির্বাচনী সংস্কার দাবি করেন।
২০১৮ সালে ওডিঙ্গা ও কেনিয়াত্তা এক চমকপ্রদ পুনর্মিলনে হাত মেলান, যা মাসব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটায়।
২০০৭ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে মওয়াই কিবাকির বিরুদ্ধে ওডিঙ্গার পরাজয় কেনিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে, যেখানে ১,২০০ জন নিহত হয় এবং প্রায় ৬ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের মধ্যস্থতায় একটি ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি হয়, যার ফলে ওডিঙ্গা প্রধানমন্ত্রী হন।
তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ওডিঙ্গা প্রায়ই বিতর্কিত নির্বাচনের পর তৎকালীন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছেন। ২০২২ সালের পরাজয়ের পর তিনি প্রেসিডেন্ট রুটোর সঙ্গে “ব্রড-বেসড” সরকারে যোগ দেন, যা তিনি জাতীয় ঐক্যের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এর আগে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভে পুলিশি সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত হয়।
রুটো প্রশাসন আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে ওডিঙ্গার প্রার্থীতা সমর্থন করেছিল, যদিও তিনি জিবুতির মাহমুদ আলী ইউসুফের কাছে পরাজিত হন।
ওডিঙ্গা তার জন্মস্থান পশ্চিম কেনিয়ায় বিশেষভাবে জনপ্রিয় ছিলেন। তার সমর্থকেরা স্নেহভরে তাকে “বাবা” (Father), “আগওয়াম্বো” (Act of God) এবং “টিঙ্গা” (Tractor) বলে ডাকতেন — যা ১৯৯৭ সালের নির্বাচনে তার দলের প্রতীক ছিল।
তিনি ছিলেন এক দক্ষ কৌশলবিদ, শক্তিশালী বক্তা এবং নিরলস প্রচারক, যিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত ছিলেন।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের আজীবন সংগ্রামী ওডিঙ্গা ছিলেন কেনিয়ার দীর্ঘতম সময়ের রাজনৈতিক বন্দি। তিনি দুইবার — ১৯৮২ থেকে ১৯৮৮ এবং ১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত — তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল আরাপ ময়ির শাসনামলে আটক ছিলেন। ১৯৮২ সালে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের অভিযোগে তার কারাবাসই তাকে জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে তুলে আনে।
দশকের পর দশক ধরে রাইলা ওডিঙ্গা কেনিয়ার রাজনীতিতে প্রতিরোধ ও সংস্কারের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার মৃত্যু দেশটির নেতৃত্বে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করেছে এবং প্রশ্ন তুলেছে — তার উত্তরাধিকার বহন করবে কে?
তিনি ছিলেন কেনিয়ার প্রথম উপ-রাষ্ট্রপতি জারামোগি ওগিঙ্গা ওডিঙ্গার পুত্র, যিনি তৎকালীন নেতা জোমো কেনিয়াত্তার (উহুরু কেনিয়াত্তার পিতা) সঙ্গে মতবিরোধের পর পদত্যাগ করেছিলেন।