চীন মিয়ানমারের কুখ্যাত বাই পরিবারের মাফিয়ার পাঁচজন জ্যেষ্ঠ সদস্যকে বৃহৎ আকারের অনলাইন কেলেঙ্কারি এবং অন্যান্য অপরাধ পরিচালনার জন্য মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। মোট ২১ জন সদস্যকে জালিয়াতি, হত্যা এবং মাদক পাচারের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এই দলটি লাউক্কাইংয়ে ৪১টি কেলেঙ্কারি কম্পাউন্ড পরিচালনা করত, যার ফলে ২৯ বিলিয়ন ইউয়ানেরও বেশি আয় হত এবং একাধিক মৃত্যুর কারণ হত। এই কঠোর শাস্তি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সাইবার অপরাধ নেটওয়ার্কগুলির উপর বেইজিংয়ের তীব্র দমন-পীড়নের লক্ষণ এবং অনুরূপ অপরাধমূলক গোষ্ঠীগুলির জন্য একটি সতর্কতা হিসেবে কাজ করে।
চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বড় আকারের প্রতারণা বিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে মিয়ানমারের কুখ্যাত মাফিয়া চক্রের শীর্ষ সদস্যদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে
চীনের একটি আদালত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে মিয়ানমারের কুখ্যাত একটি মাফিয়া দলের পাঁচজন শীর্ষ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
আদালতের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাই পরিবার ও তাদের সহযোগীসহ মোট ২১ জনকে প্রতারণা, হত্যাকাণ্ড, ইচ্ছাকৃত আঘাতসহ বিভিন্ন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
বাই পরিবার ছিল সেইসব শক্তিশালী মাফিয়াদের মধ্যে অন্যতম, যারা ২০০০ সালের দশকে ক্ষমতায় উঠে দরিদ্র সীমান্ত শহর লাউকাইন-কে জুয়া ও লালবাতি এলাকার এক সমৃদ্ধ কেন্দ্রে রূপান্তরিত করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই চক্রটি বিশাল অনলাইন প্রতারণা ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়ে, যেখানে হাজার হাজার পাচারকৃত শ্রমিক—যাদের মধ্যে অনেকেই চীনা নাগরিক—নির্যাতনের শিকার হয় এবং জোরপূর্বক অন্যদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আদায়ে ব্যবহৃত হয়। এসব অপরাধমূলক কার্যক্রমের পরিমাণ দাঁড়ায় বিলিয়ন ইউয়ান-এ।
মাফিয়া নেতা বাই সুয়োচেং এবং তার ছেলে বাই ইংচ্যাং ছিলেন ওই পাঁচজনের মধ্যে যারা শেনজেন ইন্টারমিডিয়েট পিপলস কোর্ট কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। বাকি তিনজন হলেন ইয়াং লিকিয়াং, হু শিয়াওজিয়াং, এবং চেন গুয়াংই।
এছাড়া বাই পরিবারের আরও দুই সদস্যকে সাসপেন্ডেড ডেথ সেন্টেন্স (স্থগিত মৃত্যুদণ্ড) দেওয়া হয়েছে, পাঁচজনকে আজীবন কারাদণ্ড, এবং বাকি নয়জনকে ৩ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাই মাফিয়া নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী (মিলিশিয়া) পরিচালনা করত এবং তারা ৪১টি কম্পাউন্ডে সাইবার প্রতারণা ও ক্যাসিনো পরিচালনা করত। এসব অবৈধ কার্যক্রম থেকে তারা ২৯ বিলিয়ন ইউয়ান (৪.১ বিলিয়ন ডলার; ৩.১ বিলিয়ন পাউন্ড) আয় করে। এসব অপরাধের ফলে ছয়জন চীনা নাগরিক নিহত, একজন আত্মহত্যা, এবং আরও অনেকে আহত হন।
আদালতের এই কঠোর রায় চীনের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তৃত প্রতারণা চক্র ধ্বংস করার প্রচেষ্টার অংশ এবং এটি অন্যান্য অপরাধী সিন্ডিকেটের প্রতি কঠোর বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগে, সেপ্টেম্বরে, চীনের একটি আদালত লাউকাইনের আরেক প্রভাবশালী পরিবার মিং পরিবারের ১১ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
২০০০ সালের দশকে এইসব পরিবার ক্ষমতায় ওঠে মিন অং হ্লাইং-এর সহায়তায়—যিনি বর্তমানে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রধান। লাউকাইন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর তিনি এই মাফিয়াদের প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করেছিলেন।
এই পরিবারগুলোর মধ্যে বাই পরিবারই ছিল সবচেয়ে ক্ষমতাবান। জুলাই মাসে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে বাই ইংচ্যাং বলেন, “সে সময় আমাদের বাই পরিবারই ছিল রাজনৈতিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই সবচেয়ে শক্তিশালী।”
একই প্রামাণ্যচিত্রে বাই চক্রের একটি প্রতারণা কেন্দ্রে কাজ করা এক প্রাক্তন শ্রমিক ভয়াবহ নির্যাতনের কথা জানান। তিনি বলেন, তাকে মারধর করা হয়েছিল, তার নখ টেনে তুলে ফেলা হয়েছিল, এমনকি একটি রান্নার ছুরি দিয়ে তার দুই আঙুল কেটে ফেলা হয়েছিল।
বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বাই ইংচ্যাং-এর বিরুদ্ধে আলাদাভাবে ১১ টন মেথঅ্যামফেটামিন উৎপাদন ও পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে, রাষ্ট্রীয় মিডিয়া জানিয়েছে।
এই পরিবারগুলোর পতন শুরু হয় ২০২৩ সালে, যখন বেইজিং মিয়ানমারের জান্তাকে লাউকাইনের প্রতারণা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য চাপ দেয়। সেই বছরই চীনা কর্তৃপক্ষ প্রধান সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
২০২৪ সালের শুরুর দিকে, বাই পরিবারের পিতৃতুল্য নেতা ও দীর্ঘদিনের ওয়ারলর্ড বাই সুয়োচেং-কে মিয়ানমার চীনা কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়।
জুলাই মাসের ওই প্রামাণ্যচিত্রে এক চীনা তদন্তকারী বলেন,“চীনা সরকার কেন এত পরিশ্রম করে এই চার পরিবারকে ধরছে, জানেন? কারণ এটি একটি সতর্কবার্তা—আপনি যেই হন, যেখানেই থাকুন না কেন, যদি চীনা জনগণের বিরুদ্ধে এমন জঘন্য অপরাধ করেন, তবে আপনাকে তার মূল্য দিতে হবে।”